অমিয়ভূষণ জন্মশতবার্ষিকী

সাইমিয়া ক্যাসিয়া  

…অথচ লোকনাথ, কিম্বা যাই বলো, এসেছিলো । পেমা যেন তাদের সেই পঁচাত্তর বছরের পুরনো মিছিলটাকে চোখে দেখতে পেলো । দুপুর দুটোয় দুর্ধর্ষ ঝড় উঠেছে । পাথরের কুচি উড়ছে ছিটেগুলির মতো । ঝড়ের গতি ঘন্টায় একশো মাইল । আপাদমস্তক ঢাকা, এমনকি মুখেও মুখোশ। তা সত্বেও দাঁড়ানো যায় না, এগোয় কার সাধ্য । এর চাইতে প্রাণঘাতী তুষার ঝড়ও ভালো ।

গিয়াৎসোর ভাই রিম্পোচে লামা বললো, সন্ধ্যার আগেই লা’তে পৌঁছনো দরকার, অথচ এক পাও এগোনো যাচ্ছে না।

গিয়াৎসো বললো, প্রবাদ যদি সত্যি হয় তবে এই প্রমাণ হবে যে ঝড়ের মধ্যে এগিয়ে গেলে তবে আমার তার দেখা পাবো।

গিয়াৎসো তার রেশমের ঝড়-মুখোশের আড়ালে হাসলো কিনা বোঝা গেলো না।

খচ্চরের পিঠে লাফিয়ে উঠলো রিম্পোচে । গিয়াৎসো তার পিছনে রওনা হলো । কিছুদূরে তাদেরটা অনুচরেরা । ন্যাড়া উপত্যাকাটা পার হলো তারা কিছুক্ষনের মধ্যেই। পাহাড়ের আড়াল পেলো। ঝড়ের শব্দটা কানে আসছে, কিন্তু ঝড়টা গায়ে লাগছে না আর।

গিয়াৎসো বললো, নামগিয়েল, অমিতাভ আর একবার পুনর্জন্ম নেবে এ প্রবাদ সম্মন্ধে তুমি কি পড়েছো?

প্রবাদটা প্রাচীন, তবে পনেরো পুনর্জন্মের জায়গায় সতেরো যবে না, তা বলা যায় না।

গিয়াৎসো বললো, আমাদের দেশে বিদেশী ঢুকলেই কি পুনর্জন্ম হওয়াও শেষ হবে?

রিম্পোচে বললো, না, ওটা ভয় দেখানোর জন্য বলা । চীনা আম্বনরা চায় না, নেপালীরাও চায় না তারা ছাড়া আর কোনো বিদেশী ঢোকে আমাদের দেশে।

কিন্তু কবে পুনর্জন্ম শেষ তার তো একটা প্রবাদ আছে।

সে এরকম নয়। উত্তরে কুকুর যখন চিল্লানি শুকরিকে সন্তান দেবে, তখন , গিয়াৎসো মাথা দোলালো । সেও শুনেছে, সেও জানে । তখনই, উত্তরে হিংস্র কুকুরের পাল যখন আসবে তখনই এদেশ আর স্বপ্নের দেশ থাকবে না । কিন্তু সময় হয়ে যাচ্ছে । রিম্পোচে পিছন ফিরে অনুচরদের হাতের ইশারায় তাড়াতাড়ি এগোতে বলে নিজের খচ্চরটার পেটে পায়ের গুঁতো দিয়ে সেটাকে জোরে ছুটিয়ে দিলো।

গিয়াৎসোও তাই করলো । রিম্পোচের কাছে পৌঁছে আবার সে বললো, আচ্ছা খবরটা ঠিক তো?

ঠিক, ঠিক, একশো বার ঠিক । আমাদের অন্তত সাত-আট জন চোর খবর এনেছে । সেই দক্ষিণ থেকে আসছে সিগাৎসের  পথ ধরে। শহরে জানে না এমন কেউ নেই, আর তুমি কিনা সন্দেহ করছো। সৈন্যদলকে হুকুম দেয়া হয়েছে দেখলেই সাবাড় করতে কিম্বা ধরা দিলে কয়েদ করতে ।

শেষ পর্যন্ত যদি না আসে? গিয়াৎসোর মুখ হতাশায় বিবর্ণ দেখালো।

ভয় পাবে? সে জানে চোররা খবর পেয়েছে । ভয় পাবে না এটাই একটা প্রমাণ যে সে অতীশের লোক।

লা’র মুখে দাঁড়িয়েছে দুটি খচ্চর, তাদের পিঠে গিয়াৎসো  আর রিম্পোচে। কিছুদূরে তাদের ছজন সশস্ত্র অনুচর। পথে গুপ্তচরের ভয়, সৈন্যদলের ভয়। ডাকাতের ভয়।

গিয়াৎসো বললো, এই শেষবার, রিম্পোচে। আচ্ছা বলো আমরা কি সেই আদিকাল থেকে অতীশের গুহা পাহারা দিচ্ছি? আমরা মানে আমাদের বংশ।

রিম্পোচে সিল্কের রুমালটা সরালো মুখ থেকে। বললো, তুমি সন্দেহের পাহাড়, গিয়াৎসো । সব লামা হয়ে গেলে বংশের ধারা নষ্ট হয়ে যাবে, এরকম অনেকবার হয়েছে। পরে আর একজন বুঝতে পারে অতীশের গুহার কাছের জায়গাটায় তার জায়গা। নতুন করে বাড়ি তোলে, বংশ বাড়ায়। যেমন আমাদের কাকা করেছিল ।

গিয়াৎসো বললো, হায়, হায়! এবার দেখো তুষার ঝড় উঠে পড়লো।

অতীশ ঝড়ের মধ্যে এসেছিলেন ।

ঠিক এমন সময়েই লা’র মুখে শোনা গেলো: হুম মণিপদ্মে, হুম মণিপদ্মে। গিয়াৎসো রিম্পোচের মুখের দিকে চেয়ে হাসলো। খচ্চর থেকে নেমে দুজন পাশাপাশি দাঁড়ালো। এক হাত অন্য হাতের আস্তিনে ঢুকিয়ে, মাথা সামনের দিকে নোয়ানো। সাদা কান দুটো খাড়া করে একটা খচ্চর ক্লান্ত ভঙ্গিতে তবু লাফ দিয়ে লা’র মুখের পাথরটার উপরে উঠে দাঁড়ালো।। তার পিঠের উপরে ভারতীয় শ্রমণের কানঢাকা টুপি পড়া একজন কেউ।

রিম্পোচে এগিয়ে গেলো দধিকর্ণ  থেকে নামলো ভারতীয় শ্রমণ। রিম্পোচে প্রকৃত লেখাপড়া করেছিল, হানদের  ভাষা জানতো, এমনকি দক্ষিণ মহাদেশের ভাষাও  কিছুকিছু জানতো। সেই ভাষায় দু-একটি প্রার্থনাও।

সেই এক পা এগিয়ে গিয়ে মাথাটা সামনের দিকে আরো নুইয়ে বললো, বুদ্ধম শরণাম গচ্ছামি…

লোকনাথ বললো, গচ্ছামি, সংঘম শরণাম গচ্ছামি ।

গিয়াৎসো এগিয়ে গিয়ে লোকনাথের জামার প্রান্ত তুলে চুমু খেলো।

এবার দক্ষিণের মিছিল উত্তরে ফিরলো। সামনে সশস্ত্র লস্কর। ডাইনে রিম্পোচে। বাঁয়ে গিয়াৎসো, মাঝে লোকনাথ ।

পিছনে তুষারের ঝড়। মিছিল এগিয়ে চললো। আর – অমিতাভায় লোকনাথায়, অমিতাভায় অমিতকারুণ্যে লোকনাথায়। এ রকমই  কি একটা কিছু তখন  শোনা গিয়েছিলো ।…